ঢেউ

একাদশ ছবি মেলা ফেলোশিপ প্রোগ্রামের ৯ জন শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনী ঢেউ। সময়, স্মৃতি, সম্পর্ক ও অস্তিত্বকে পুন:পাঠ করার মধ্য দিয়ে এই প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত, অস্থির অনুভূতি ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। বাতাস যখন পানির পৃষ্ঠে শক্তি প্রয়োগ করে, কম্পনের ফলে ঢেউয়ের জন্ম হয়, ঢেউয়েরা আবার মিলিয়ে যায়। ঢেউ কখনো সমুদ্রের স্মৃতি, কখনো হারিয়ে যাওয়া ভূমি, কখনো স্থাপত্যের ক্ষয়, যন্ত্রের যন্ত্রণা, পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্ব, কিংবা প্রযুক্তির নজরদারিমূলক দৃষ্টি বিষয়ে আলাপ করে।

লোহা, মাটি, পানির মতো দৃশ্যমান আবার স্মৃতি, হারানোর বেদনা কিংবা বাতাসের মতো অদৃশ্য উপকরণগুলো ধারণ করার জন্য শিল্পীরা আলোকচিত্র, ভিডিও, ডিজিটাল ইন্টারফেস, শব্দ ও আর্কাইভের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের কম্পনগুলোকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন। ঢেউ তখন কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয় – এটি সময়ের ভাষা, অনুভূতির গতি, এবং মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বের উচ্ছ্বাস। পুনরাবৃত্তের ছকে বাঁধা একটি ধারণা, যা পেছনে ফিরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

প্রদর্শনীটি আমাদের কাছে ঢেউয়ের মতোই ক্ষণস্থায়ী, যা প্রতিনিয়ত নির্মিত হয়, আবার মিলিয়ে যায়। ভাঙা-গড়ার এই প্রক্রিয়ায় কিছু চেনা ও পরিচিত শব্দ, দৃশ্য ও অনুভূতিকে নিয়ে রচিত হয় অর্থমালা। যা দর্শককে আহ্বান জানায় অনিশ্চিত ও ক্ষণস্থায়ী অথচ গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক মুহূর্তগুলোর ভেতর দিয়ে ঢেউয়ের মতো ভ্রমণ করতে। শেষমেশ, শিল্পকর্মগুলো স্মৃতি-বিস্মৃতি, নজরদারি কিংবা শোক, উত্তরাধিকার এবং ক্ষতির প্রতি মনোযোগী হতে বলে; প্রবাহমান অনুভূতির সাক্ষী হয়ে উঠে ঢেউ।

“ঢেউ” একটি যৌথ প্রদর্শনী, ছবিমেলা ফেলোশিপের নয়জন শিল্পী সময়, স্মৃতি, সম্পর্ক ও অস্তিত্বকে পুন:পাঠ করেন। এই প্রদর্শনীর কাজগুলোও ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত, অস্থির অনুভূতি ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে প্রাসঙ্গিক করে। বাতাস যখন পানির পৃষ্ঠে শক্তি প্রয়োগ করে, কম্পনের ফলে ঢেউয়েদের জন্ম হয়, ঢেউয়েরা আবার মিলিয়ে যায়—ঢেউ কখনো সমুদ্রের স্মৃতি, কখনো হারিয়ে যাওয়া ভূমি, কখনো স্থাপত্যের ক্ষয়, যন্ত্রের যন্ত্রণা, পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্ব, কিংবা প্রযুক্তির নজরদারিমূলক চোখ বিষয়ে আলাপ-সংলাপ-প্রলাপ করে। শিল্পীরা লোহা, মাটি, পানির মতো দৃশ্যমান আবার স্মৃতি, হারানোর বেদনা কিংবা বাতাসের মতো অদৃশ্য উপকরনকে ধারণ করবার জন্য আলোকচিত্র, ভিডিও, ডিজিটাল ইন্টারফেস, শব্দ ও আর্কাইভের মতো উপাদান ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের কম্পনগুলোকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন। ঢেউ তখন কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—এটি সময়ের ভাষা, অনুভূতির গতি, এবং মিলিয়ে যাওয়ার আগের উচ্ছ্বাস। এই প্রদর্শনী দর্শককে আহ্বান জানায় ঢেউয়ের মতোই অনিশ্চিত সময়, ক্ষণস্থায়ী অথচ গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক মুহূর্তগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটতে—যেখানে কাজগুলো স্রোতের মতো অনুভূতিগুলোর সাক্ষী হয়ে উঠতে চায়।

পুলকের liminal space বা সীমাবদ্ধ স্থান এর ধারণা site-specific বা স্থান নিদ্ধিষ্ট উপসর্গ নিয়ে পুনঃপরিকল্পিত হয় ল্যাপটপের ইন্টারেক্টিভ দেয়ালে। একটি কিউবিক স্পেসে আর্ট ধারণের আকাঙ্খায় দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ালগুলোর সাথে কিভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে ঢাকার করাইলের ঢেউটিনের ভাঙা, কাটা, জংধরা উপকরণে নির্মিত একটি শরীর, পুলকের ঢেউটিন প্রদর্শনী স্পেসের আয়তাকার দেওয়ালগুলোকে সাময়িক প্রশ্ন করে। সমসাময়িক ঢাকাবাসীর যাপনের সাথে অনিশ্চিত কিছু আওয়াজকে উপস্থাপন করে যা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসনে মানুষের শব্দের সাথে স্থানের শব্দের কোরাস এবং সাক্ষ্য দেয় প্রান্তিক জীবনে সীমাবদ্ধ পরিবেশকে। কোরাসের এই মিথস্ক্রিয়া জনসংখার ঘনত্ব বাড়তে থাকা ঢাকা শহরের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিনিয়ত সীমাবদ্ধতাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। পুলক দর্শককে স্বাগত জানায় সীমাবদ্ধ স্পেস দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা নিতে, প্রদর্শনীর প্রতিবেশী আরো আট শিল্পকর্মের পাশাপাশি, প্রস্তাবিত liminality বা সীমাবদ্ধতা বিষয়ে শিল্পকর্মটি নির্মিত হয়েছে প্রদর্শনীর স্থানে, স্থানের নানামুখী সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে।

মৃত্তিকার কাজে খুঁজে পাওয়া যায় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন—যাদের জমি তলিয়ে গেছে ঢেউয়ের গভীরে। যেখানে আমরা দেখি ঢেউ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, সময়ের ঢেউ , স্মৃতির ঢেউ। মৃত্তিকার প্রোটাগোনিস্ট সেই ঢেউয়ের মাঝে প্রত্যক্ষ করে তার হারিয়ে যাওয়া ভূমি, বাড়ি ও জড়িয়ে থাকা স্মৃতি—যা প্রোটাগোনিস্টকে করে তোলে অনুসন্ধানী। ঢেউ কি বাড়ি নাকি হারিয়ে যাওয়া দলিল? বাড়ি কি তাহলে এক ক্ষণস্থায়ী আশ্রয়, ‘বাড়ি’ কি অস্থায়ী অনুভূতি—ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত। এই অস্থায়িত্ব শহরের স্থায়ী বাড়ির ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, আবার গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। ভূমির কম্পন শহুরে জীবনে জন্ম দেয় ভয় ও উদ্বেগ, তেমনি নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ব-দ্বীপের উপকূলীয় মানুষের জীবনে জন্য হয়ে উঠে অনিশ্চয়তা।

মণি মাঝির সুন্দরবনের ভূদৃশ্য একটি দৃশ্যমান পটভূমি নয়—সম্ভবত একটি জীবন্ত আর্কাইভ; যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত হয়ে আছে পরিবেশগত জ্ঞান, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সম্মিলিত স্মৃতি। নদী ও বনের পরিবর্তিত ঢেউকে স্থানীয় সম্প্রদায় যেভাবে অনুভব করে, পাঠ করে ও ব্যাখ্যা করে—তার মধ্যেই প্রকাশ পায় প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নির্ভরতার সম্পর্ক, অভিযোজনের কৌশল এবং গভীর স্থিতিস্থাপকতা। log-form ভিডিও IP ক্যামেরার মাধ্যমে সুন্দরবনের জল, জমিন ও আকাশের লাইভ স্ট্রিমিং দর্শককে নিয়ে যায় এক দ্ব্যর্থক অভিজ্ঞতায়—যেখানে নৈসর্গিক দৃশ্য ধীরে ধীরে রূপ নেয় surveillance বা নজরদারির অনুভূতিতে, প্রকৃতি হয়ে ওঠে দর্শিত ও পর্যবেক্ষিত living organism বা সজীব সত্তা।

মুনিয়া তার মায়ের জীবনের ভেতর দিয়ে নিজের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করে। সমুদ্রের বিশাল অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নতুন করে আবিষ্কার করে মা–বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের মানচিত্র। বাবার সাথে অদৃশ্য দূরত্বকে পুনর্বিবেচনার ইচ্ছায়, মা–বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সে যায় কক্সবাজারে—একসঙ্গে গান শোনে, দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলে—সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে একটু একটু করে অনুভূতির স্তরগুলোকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করে—মুনিয়ার চলমান রিসার্চ হয় উঠবার চেষ্টা করে দেখা ও অভ্যস্ততাকে প্রশ্ন করার সংবেদনশীল অনুশীলন, নিজের সঙ্গে সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা।

রাকিবুল self-portrait-এর মধ্য দিয়ে যমজ ভাইয়ের স্মৃতি ও অস্তিত্বকে খুঁজতে চান—আমরা খুঁজতে থাকি তার বাড়িতে থাকা কেমিক্যালে শুকোতে দেওয়া ১২৮ টি ছবি, যেগুলি ঘরে রেখে সশরীরে উপস্থিত হন তিনি, প্রক্রিয়া নিয়ে বলতে থাকেন, প্রসেস চর্চায়, আলাপের ফাঁকে ফাঁকে মিশে থাকে কেমিক্যালের রং, রূপ আর গন্ধ—একটি জীবন্ত ডার্করুমের অভিজ্ঞতা। তার ছবি নির্মিত হয় বাক্স ক্যামেরা ও কেমিক্যালের রিঅ্যাকশনে। একক ছবির স্বতন্ত্র সম্ভাবনাকে ব্যবহার করেও তিনি সমসাময়িক ফটোগ্রাফিক গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুঁজেন যেখানে একক ছবিগুলো কোলাজ রূপে একটি ফটো–স্টোরির আকার নিতে চায়—ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অনুপস্থিতির বয়ানে।

দেবাশিস দুব দর্শককে আহ্বান জানান এক psychedelic অভিজ্ঞতার ভেতর প্রবেশ করতে। দর্শক বাক্সে চোখ রেখে চলমান ডিজিটাল চিত্রগুলোকে বদলাতে পারেন, কীবোর্ডে চাপ দিয়ে বদলে নিতে পারেন নিজের শ্রবণ–অনুভব, কয়েকটি রঙের ফিল্টার দিয়ে দৃশ্য ও অনুভূতির রং ও বদলে নিতে পারেন, দেখার অভিজ্ঞতাকে প্রশ্ন করতে পারেন।

পোস্ট–কলোনিয়াল সময়ের নীরবতায় কুষ্টিয়ার উৎপাদনহীন হয়ে পড়া মোহিনী মিল—একটি কলোনিয়াল স্থাপত্যের স্মৃতিবাহী শরীর। সেই শরীরের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা সময়, ক্ষয় ও ইতিহাসের চিহ্নকে আশ্রয় করে ইমতিয়াজ আঁকছেন মিলের আর্চ, বারান্দা, দালান আর খড়খড়ির জ্যামিতিক রূপক। স্থাপত্যের এই অনুপ্রেরণা থেকে তিনি উপস্থাপনার মাদ্ধম খুঁজে নিচ্ছেন জাঙ্ক মেশিনের খণ্ডাংশ ও আধুনিক স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য উপাদান—লোহা। প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত লোহা দিয়ে আঁকা ড্রইংগুলো দর্শক ধরে দেখতে পারবেন। স্থাপত্যের বয়স—ইমতিয়াজের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বুড়িয়ে যাওয়া মিলটির নান্দনিক ক্ষয়, স্মৃতি ও রূপান্তরের সংবেদনশীল অনুভূতিগুলোকে ইমতিয়াজ ধরবার অনুভূতি দিতে চান।

উমামার শিল্পকর্ম প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করে, তার বানানো গেমে প্রোটাগোনিস্ট খুঁজে বেড়ায় তার বন্ধুকে—এক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শহরের ভেতর। উমামা উত্তর খোঁজেন একটি প্রশ্নের, আমাদের অনেকের মতোই, কেন ক্ষমতার রং, রূপ ও চামড়া বদলালেও তার কাঠামো অপরিবর্তিত থেকে যায়?

মং মং-এর কাজ প্রশ্ন করে ক্ষমতা কাঠামোকে, ক্ষমতা-মাদকে আচ্ছন্ন ডেটা ব্যাপারীদের—যারা সাইবারনেটিক ষড়যন্ত্রের তেজস্ক্রিয় জালে মানুষের চেতনাকে বেঁধে ফেলেছে। তার ভিডিও স্থাপনার মাধ্যমে তিনি চেতনাজগতের দৃশ্যপট নির্মাণের চেষ্টা করেন। উমামা যেখানে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমাজে দর্শককে খেলায় আমন্ত্রণ জানান, সেখানে মং মং দর্শককে চলমান ইমেজের ভেতর এক গভীর ইমার্সিভ অভিজ্ঞতা দিতে চান।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো আমাদের কাছে ঢেউয়ের মতোই ক্ষণস্থায়ী—প্রতি নিয়ত নির্মিত হয়, আবার মিলিয়ে যায়। চেনা ও পরিচিত শব্দ, দৃশ্য ও অনুভূতিগুলোকে নিয়ে জন্ম দিতে চায় কিছু শব্দ, কিছু অর্থের ঢেউ।ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব, যেখানে মুহূর্তগুলো ঢেউয়ের মতো মিশে যায়—ধীরে ধীরে—একটি ধারণা, অথবা সম্ভবত গতি, পেছনে ফিরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ায়, একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্নের মতো। ভূদৃশ্য একটি পরিবর্তনশীল ইকোলজি এবং ম্যানগ্রোভের ভঙ্গুর মানচিত্র দেখে, স্মৃতি এবং ভুলে যাওয়া, নজরদারি এবং শোক, উত্তরাধিকার এবং ক্ষতির দিকে মনোযোগী হতে স্বাগত জানায়:


নতুন একটি সূচনা কি এখনও উদ্ভূত হতে পারে, না কি অপেক্ষা নিজেই অসীম হয়ে গেছে?

এবং তারপর একটি জিজ্ঞাসা: আমরা এগিয়ে যেতে কোন অতলে ফিরে তাকাব?

আমাদের কী পুনর্গঠন, পুনর্কল্পনা বা প্রত্যাখ্যান করতে হবে?